Home » » প্রধান আসামি নূর হোসেনের কার্যালয়ে আগুন

প্রধান আসামি নূর হোসেনের কার্যালয়ে আগুন

Written By setara on Thursday, May 1, 2014 | 4:34 AM

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নূর হোসেনের ব্যক্তিগত কার্যালয় ভাঙচুর করে আগুন দিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা। আজ বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার পর এ ঘটনা ঘটে। সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও তাঁর চার সহযোগী অপহরণের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন। শিমরাইলে সিটি করপোরেশনের ট্রাক টার্মিনালের ভেতরে নূর হোসেনের ব্যক্তিগত কার্যালয়টি অবস্থিত। আজ বেলা সাড়ে ১১টার পর বিক্ষুব্ধ জনতা ওই কার্যালয় ভাঙচুর করে ও আগুন দেয়। কার্যালয়ের পাশে থাকা মেলার নামে চলা অশ্লীল নৃত্য ও জুয়ার আসরের প্যান্ডেলও ভাঙচুর করে আগুন দিয়েছে জনতা। এর কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছে। নজরুল ও তাঁর চার সহযোগী অপহূত হওয়ার পর আবারও আলোচনায় আসেন কাউন্সিলর নূর হোসেন। এ ঘটনায় তাঁকে প্রধান আসামি করে মামলা করেছে নজরুলের পরিবার।

কাঁচপুরে শীতলক্ষ্যা নদী দখল করে বালু-পাথরের ব্যবসা, উচ্ছেদে বাধা, পরিবহনে চাঁদাবাজিসহ নানা কারণে বারবার আলোচনায় এসেছেন সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নূর হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, কাঁচপুর ও সিদ্ধিরগঞ্জে চাঁদাবাজি, নদী দখল, মাদক ব্যবসাসহ অনেক কিছুরই নিয়ন্ত্রক তিনি ও তাঁর লোকজন। তাঁর বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা থানায় ছয়টি হত্যা মামলাসহ ২২টি মামলা রয়েছে।

গত রোববার দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়ক থেকে অপহূত কাউন্সিলর নজরুলসহ ছয়জনের লাশ গতকাল বুধবার উদ্ধার করা হয়েছে বন্দর থানার শীতলক্ষ্যা নদী থেকে। একই সড়ক থেকে প্রায় একই সময়ে অপহূত হন নারায়ণগঞ্জের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তাঁর গাড়ির চালক ইব্রাহিম। আওয়ামী লীগ-সমর্থক নজরুলের পরিবারের অভিযোগ, বিরোধের জের ধরে নূর হোসেন ও তাঁর লোকজন এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। রবি ও সোমবার নূর হোসেন এ অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে মঙ্গলবার থেকে তাঁর মুঠোফোন বন্ধ থাকায় চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য নেওয়া যায়নি।

এলাকার লোকজন জানান, ট্রাকের সহকারী (হেলপার) হিসেবে জীবন শুরু করা নূর হোসেন পরে চালক হন। ১৯৯২ সালের পর তিনি কৃষক লীগের সাবেক নেতা ও পরে বিএনপির সাবেক সাংসদ গিয়াসউদ্দিনের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে যোগ দেন বিএনপিতে। সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তিনি শামীম ওসমানের হাত ধরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। এরপর সিদ্ধিরগঞ্জে তিনি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন। ওই সময় তাঁর বিরুদ্ধে দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ ১৩টি মামলা হয়। বাংলাদেশ ট্রাকচালক শ্রমিক ইউনিয়ন কাঁচপুর শাখার সভাপতিও হন তিনি। ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি এলাকায় ছিলেন না। ওই সময় তিনি ছিলেন পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাঁকে ধরিয়ে দিতে ইন্টারপোলে রেড নোটিশও পাঠানো হয়েছিল। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনের পর তিনি এলাকায় ফেরেন। গত বছর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে তিনি ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাজধানীতে প্রবেশের অন্যতম পথ শিমরাইল মোড় ও কাঁচপুরে পরিবহনে চাঁদাবাজিসহ সবকিছু এখন নিয়ন্ত্রণ করেন নূর হোসেন ও তাঁর লোকজন।

পরিবহনে চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে ২০১২ সালের আগস্টে নূর হোসেনের বিরুদ্ধে পুলিশ ও র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ দেন ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতুল্লাহ। র‌্যাবের মহাপরিচালক বরাবর দেওয়া অভিযোগে বলা হয়, অনেক দিন ধরে কাঁচপুর সেতু ও চিটাগাং রোডে স্থানীয় হোসেন চেয়ারম্যানের (নূর হোসেন) নেতৃত্বে কিছু মাস্তান পরিবহনগুলো থেকে প্রতিদিন দু-তিন লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে। চাঁদা না দিলে পরিবহনকর্মীদের মারধর ও গাড়ি ভাঙচুর করা হচ্ছে। চাঁদাবাজির প্রতিবাদে ব্যাটারিচালিত রিকশার চালক ও মালিকেরা নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সমাবেশ করেন ও বিভিন্ন জায়গায় স্মারকলিপি দেন। পরে প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর হস্তক্ষেপে ওই চাঁদাবাজি বন্ধ হয়।

নদী দখল ও বিআইডব্লিউটিএর মামলা
বিআইডব্লিউটিএর সূত্র জানায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কাঁচপুর সেতুর নিচে শীতলক্ষ্যার তীর দখল করে নূর হোসেনদের গড়ে তোলা বালু ও পাথরের ব্যবসা উচ্ছেদ করা হলেও নবম সংসদ নির্বাচনের পর আবারও নদী দখল করে এ ব্যবসা করছেন তিনি। হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে কাঁচপুর সেতুর নিচে শীতলক্ষ্যার তীর অবৈধভাবে দখল করে বালু-পাথরের ব্যবসা গড়ে তোলার অভিযোগে নূর হোসেনকে প্রধান আসামি করে ২০১০ সালে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মামলা করেছিলেন বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের পোর্ট কর্মকর্তা। মামলায় সরকারি কাজে বাধাদান, সরকারি কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়া এবং নদীতীরের প্রায় ৮০০ শতাংশ জমি দখলের অভিযোগ আনা হয়। গত কয়েক বছরে ওই দখল উচ্ছেদে আট-দশবার অভিযান চালানো হয়। মামলার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় ২২টি চিঠি দেওয়া হয়েছে।

মেলার নামে অশ্লীল নৃত্য-জুয়া
অভিযোগ রয়েছে, সিদ্ধিরগঞ্জে সিটি করপোরেশনের ট্রাক টার্মিনালে এক বছরের বেশি সময় ধরে মেলার নামে চলছে অশ্লীল নৃত্য ও জুয়ার আসর। মেলায় অবাধে মাদকও বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় কাউন্সিলর নূর হোসেনকে এ মেলা বন্ধ করতে গত ১৬ এপ্রিল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল মজুমদার চিঠি দিলেও মেলা বন্ধ হয়নি।

সূত্রগুলো জানায়, ২০১৩ সালের ১৭ এপ্রিল নূর হোসেনের সহযোগী হিসেবে পরিচিত ফরহাদ হোসেন ওই ট্রাক টার্মিনালে ব্যবসা ও ইনডোর গেমস চালানোর জন্য হাইকোর্টে রিট করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ মেলায় বাধাদান ও হস্তক্ষেপ না করতে রুল জারি করেন এবং ইনডোর গেমসের নামে অবৈধ কর্মকাণ্ড না করার নির্দেশ দেন।

সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মতিন বলেন, হাইকোর্টের অনুমতি সাপেক্ষে শিমরাইল ট্রাক টার্মিনালে গত বছর থেকে মেলা চলছে। আদালতের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী আরও দুই মাস মেলা চালানো যাবে। মেলায় জুয়া, মাদক ব্যবসা, অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবুর রহমান জানান, এ মেলা সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না। অপহরণের পরে রবি ও সোমবার নূর হোসেনের ফোন খোলা থাকলেও মামলার পরে মঙ্গলবার থেকে ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তাই এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া যায়নি।

0 comments:

Post a Comment